বিসিএসে সফলতা পেতে হলে থাকতে হবে সঠিক কর্মপরিকল্পনা ।৪০তম বিসিএস।

গত ৩০ মার্চ ৪০ তম বিসিএসের ফল প্রকাশিত হয়।৪০তম বিসিএসে ১ হাজার ৯৬৩ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছে পিএসসি।যারা ৪০তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিভিন্ন বিভাগের ক্যাডার হয়েছেন তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে তা নিয়ে একটি সিরিজ প্রতিবেদন তৈরি করছেমর্নিং ট্রিবিউন  । আজ হচ্ছে তার সপ্তম পর্ব ।

আজকে আমাদের সাথে আছেন আবু সালেহ আব্দুর নূর যিনি ৪০তম বিসিএসে কাস্টম ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত। এই প্রতিনিধির সাথে যখন অনলাইনে  সদুর ঠাকুরগাঁও থেকে কথা হয়েছিল তখন  নিজের অতীত কর্মজীবন আর অধ্যবসায়ের গল্প তারপর বিসিএস ক্যাডার হওয়ার যে জার্নি আর তার আগামীর কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে  বলছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবু সালেহ আব্দুর নূর।  সম্প্রতি ৪০তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কাস্টম ক্যাডার হয়েছেন তিনি।

আবু সালেহ আব্দুর নূরের বেড়ে ওঠা রোড বাজার এলাকার এক ব্যবসায়িক পরিবেশ থেকে। অনেকটা সামাজিক লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন বলতে পারেন। তার বাবা একজন  মাল্টি ট্যালেন্টেড মানুষ।তার মতে,”এই পৃথিবীতে খুব কমই পাবেন।তার মত স্বনামধন্য ব্যবসায়ীর সন্তান হতে পেরে আমি সত্যিই গর্বিত।আমার জীবনের সাফল্যের প্রথম বীজ রোপণ করেছিলেন আমার আব্বু।সেই বীজ থেকে আজ বেড়ে ওঠার প্রত্যেকটি পদক্ষেপে আব্বু খুব সুনিপুণভাবে খেয়াল রেখে ছিলেন।বর্তমানে শীতলতা শুভ্রতার মাঝে ঘুমিয়ে ওপার থেকে আমার এই সাফল্য উপভোগ করছেন।বেঁচে থাকলে তার মত গর্বিত পিতা খুব কমই হতেন।আমার বিসিএস এর প্রিপারেশন টি ছিল আব্বু মারা যাওয়ার পর থেকে।সুতরাং বুঝতেই পারছেন আমার জীবনে আম্মুর রোল কতটুকু।সান্তনা ভালোবাসা মায়া-মমতা সাপোর্ট যতটুকু পারা সম্ভব আমাকে এই সময়টিতে আম্মু সহযোগিতা করেছিল।‘’  বর্তমানে আবু সালেহ নূরের পরিবারে আছে তার মা,ছোট দুই বোন এবং স্ত্রী।

আবু সালেহ আব্দুর  নূরের জীবনের মূলমন্ত্র একটু ভিন্ন  তিনি বলেন,’’সাগরের অথৈই দিগন্ত পাড়ি দেবার ইচ্ছে আমার কোনদিনই ছিল না তবে সমুদ্রের বিশালতার মাঝে জীবনকে উপভোগ করার ইচ্ছে আমার ছিল।আমার জীবনের সাফল্যের মূলমন্ত্র হিসেবে আমি চারটি জিনিস কে প্রাধান্য দেব। ১.ধৈর্য ২.পরিশ্রম ৩.বিনয়ী ৪.মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি অগাধ বিশ্বাস।‘’

আবু সালেহ আব্দুর নূর ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় হতে দিনাজপুর বোর্ডের অধীনে ২০০৯ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হন।এরপর  ২০১১ সালে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০১১-১২সেশনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ ভর্তি হন এবং সেখানেও  স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ফলাফলে তিনি মেধার স্বাক্ষর রাখেন।

এরপর মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করি।আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল,শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল ও শামসুল হক হলে,অবস্থান করেছি।বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিচারণ বলতে গেলে আমার জীবনের জীবনসঙ্গীকে আমি এখান থেকে পেয়েছি।বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির তার সাথে আমার এক মাসের ব্যবধানে পরিচয় হয় এবং শুভ পরিণয়।

আবু সালেহ আব্দুর নূর চাকুরির প্রস্তুতি যেভাবে নিয়েছেন তার বর্ণনায় তিনি বলেন,‘’আমি ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে।পড়াশোনা করে চাকরি করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আমার জীবনে ছিল না। ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান হিসেবে মর্যাদা ও আত্মসম্মান অর্জন করার জন্য জীবনের লক্ষ্য ঠিক করেছিলাম। ইউনিভার্সিটি জীবনে আমার লক্ষ্য ছিল আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক হব।সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল বাট ২০২০ সালের ২১ এপ্রিল আমার জীবনের স্বপ্ন ভঙ্গ হয় আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালকের ভাইবা থেকে বাদ পড়ি।এই রেজাল্টের ঠিক সাতদিন পরে আমার বিসিএস এর প্রিলি ছিল।এতটা ভঙ্গুর মন নিয়ে কখনো প্রিলি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে এটা স্বপ্নেও ভাবেনি।অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।জীবনে ইচ্ছা ছিল একবার যদি বিসিএস রিটেন দিতে পারি জীবনের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করব।মহান আল্লাহতা’লা আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছেন  এবং আমি সঠিকভাবে কাজে লাগানোর কারণে আজকে সহকারী কমিশনার শুল্ক আবগারী ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছি।

আমার চাকরিকালীন মুহূর্তটা আমার জীবনের সবচাইতে কষ্টের মুহূর্ত ছিল। বাসায় অসুস্থ বাবাকে বিছানায় রেখে চারশো কিলোমিটার দূরে যাওয়ার কষ্ট এবং চাকরির প্রিপারেশন নেয়া টা জীবনের সবচাইতে চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার ছিল।এই অনুপ্রেরণা আমাকে সাফল্যের পথে আসতে সাহায্য করেছিল।এছাড়াও আমার বর্তমান সহধর্মিনীর সাপোর্টিং মেন্টালিটি আমাকে সাফল্যের স্বর্ণ চূড়ায় উঠতে সাহায্য করেছিল।

বিসিএস প্রিপারেশনের ক্ষেত্রে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল আমাদের লাইব্রেরী ওয়ার্ক। সকাল আটটা থেকে রাত দশটা অবধি আমাদের এই পরিশ্রমই আজকের এই পরিচয় বহন করে।গল্প আড্ডা খুনসুটি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে ছিলাম।

মূলত অনার্স শেষ হওয়ার পরে মাস্টার্স এর ভর্তি হওয়ার পর থেকে বিসিএস প্রিপারেশন নেয়া শুরু করেছিলাম আমি প্রিলিমিনারি পরীক্ষার জন্য বেসিকালি একটি সিরিজের বই কে প্রাধান্য দিতাম। ।এরপর নিজের বেসিক কে মজবুত করতাম স্ট্রং জোনকে কাজে লাগাতাম এবং উইক জোনকে বারবার চর্চার মাধ্যমে আয়ত্তে আনতাম। প্রিলির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে সাইন্সের মার্ককে গুরুত্ব দিতাম। রিটেনের জন্য পরিশ্রমের কোন বিকল্প নেই দৈনিক ১০  থেকে ১২ ঘণ্টা অবশ্যই পড়তে হবে। ভাইবার জন্য নিজেকে ক্যাপাবল বানাতে হবে এবং ভাইবা বোর্ড  মোকাবেলার জন্য প্রত্যেকটি কোচিংয়ের ডিফেন্সিভ অ্যানসার দিতে হবে এবং সেটাকে ক্র্যাক করার  দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

নবীনদের উদ্দেশ্যে আমার একটি বার্তা থাকবে দিনশেষে বিসিএস একটি চাকরি মাত্র।যদি বিসিএস ক্যাডার হতে চাও তবে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস কে বুকে ধারণ করে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করো এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সঠিক পথে সঠিক ভাবে সময়কে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাও এবং মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো।তাহলে সাফল্য অনিবার্য।

কর্মক্ষেত্রে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে বলেন, এখনো ঠিক ভাবে নির্ধারণ করে নি তবে বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণে এ অংশ নেয়ার ইচ্ছা আছে এবং সৎ দক্ষ এবং নির্ভীক থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা আছে।নিজের যোগ্যতা আর মেধার পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস তথা প্রশাসন যন্ত্রের একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করতে চাই।‘’

 

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *