
জসিম আলী, কুমিল্লা
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার দশটি গ্রামের মত সাধারন একটি গ্রাম নলুয়া চাঁদপুরকিন্ত আ গ্রামে বাস করেন একজন অসাধারন মানু । কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত গ্রামটি । মহাসড়কের পশ্চিম পাশে ১৯৯৭ সালে নলুয়া চাঁদপুর উচ্চবিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটির প্রতিষ্ঠার গল্প আট-দশটি স্কুলের মতো নয়।যার পিছনে আছে আকজন স্বপ্নবাজ মানুষের গল্প। যিনি তার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য জীবনের সব সহায় সম্বল ত্যাগ করে দিয়েছেন।
গ্রামের রাস্তার পাশে একটি চায়ের দোকান ছিল নলুয়া চাঁদপুর গ্রামের মাক্কু মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ আবদুল খালেকের। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। বাবা কৃষিকাজ করতেন। বড় ছেলে হিসেবে তার কাঁধে উঠে পরিবারের জোয়াল। চা দোকানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে সেই জোয়াল টানতে থাকেন। কিছু টাকা জমিয়ে দোকানের কাছে ৫৪ শতক জমি কিনেন।
চা দোকানি হলেও আবদুল খালেক সব সময় ব্যক্তিত্ব বোধ নিয়ে চলতেন। বাজে ব্যবহার করা লোকদের দোকানে বসতে দিতেন না। দোকানে বসে কিংবা গ্রামের পথেঘাটে একজন অন্যজনকে নাম বিকৃত করে ডাকে। রহিমকে রউম্যা, খালেককে খালিক্কা ইত্যাদি নামে ডাকে। তাঁর নিজের নাম কেউ বিকৃত করে ডাকলে তিনি মনে কষ্ট পেতেন। পরে ভাবলেন শিক্ষার অভাবে তারা মানুষের নাম বিকৃত করে। এই গ্রামের ৮০ ভাগ লোক ছিল নিরক্ষর। কিছু ছেলে-মেয়ে প্রাইমারিতে পড়লেও দূরে হওয়ায় হাইস্কুলে যাচ্ছিল না। তিনি দোকানে এক দিন বললেন, গ্রামে একটি স্কুল করা দরকার। তা শুনে অন্যরা বলল জমি কে দেবে? তিনি বললেন, তিনিই জমি দেবেন। পরের দিন তিনি ঘুমে থাকতেই অনেকে এসে তাঁর দরজা ধাক্কাতে লাগলেন। তারা জানতে চাইলেন স্কুলের জমি দেবেন শুনলাম। আমরা ঝুড়ি কোদাল নিয়ে এসেছি মাটি কাটতে। এভাবে গ্রামের মানুষ থেকে বাঁশ-কাঠ আর নগদ টাকা চেয়ে এনে গড়ে তুললেন নলুয়া চাঁদপুর উচ্চবিদ্যালয়। শিক্ষক হিসেবে এগিয়ে এলেন গ্রামের কিছু স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক ও তরুণ। প্রথমদিকে এগিয়ে এসে স্কুল প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেছিলেন গ্রামের আবদুর রহিম, সিরাজুল হক, সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম মজুমদার, প্রথম প্রধান শিক্ষক সফিউল্লাহসহ এলাকার দানশীল ব্যক্তিরা।
মোহাম্মদ আবদুল খালেক ব্যক্তিগত জীবনে নিঃসন্তান। ১৯৯৯ সালের ২৮ অক্টোবর। স্কুল দেখে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর স্ত্রী সখিনা বেগম মারা যান। ২০১৫ সালে তাঁর চা দোকানটি ঝড়ে উপড়ে ফেলে। তাঁর কোনো সহায়-সম্বল নেই। এখন রাতে ভাই-ভাতিজাদের সঙ্গে থাকেন। দিনে তিনি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটান।
স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, স্কুল মাঠে লাঠি ভর দিয়ে এক বৃদ্ধ মানুষ কুঁজো হয়ে হাঁটছেন। তাঁর পাশে হাঁটছেন শিক্ষার্থীরা। সবাই তাঁর কুশল জিজ্ঞাসা করছেন। কুঁজো হয়ে গেলেও তিনি একজন দৃঢ়চেতা এবং রসিক মানুষ। প্রতিবেদককে বলেন, আমার শরীরের বয়স ৯৩ বছর, তবে মনের বয়স ২৭! তিনি এখনো স্কুলকে ঘিরে নানা স্বপ্ন দেখেন। তিনি চান স্কুলটি সরকারি হোক। তাঁর এলাকার শিক্ষার্থীরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক ।
মোহাম্মদ আবদুল খালেক বলেন, আমি ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছি। অভাবের সংসারে বেশি দূর পড়তে পারিনি। স্কুলের জন্য জমি দেওয়ায় প্রথমদিকে গ্রামের ও পরিবারের লোকজন আমাকে পাগল বলত। যেদিন আমার স্ত্রী স্কুল দেখে বললেন, একটি ভালো কাজ করেছেন। সেদিন অনেক আনন্দ পেয়েছি। তিনি আরও বলেন, আমি শিক্ষার জন্য একটি ফুল বাগান করে দিয়েছি। এখন শিক্ষক ও এলাকাবাসীর দায়িত্ব তার পরিচর্যা করা। স্কুলটি সরকারিকরণ হলে এলাকার শিক্ষার্থীরা বিনা বেতনে পড়তে পারবে। তিনি স্বপ্ন দেখেন এখানে এক দিন একটি কলেজও প্রতিষ্ঠিত হবে। স্কুলের সাবেক কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, আবদুল খালেকের জীবনী ও ত্যাগের বিষয়টি স্কুলে খোদাই করে স্থাপন করা যেতে পারে।
