মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার

“মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার”

ঢাবি প্রতিবেদকঃ

স্টেনগানের হিংস্র গর্জনে প্রকম্পিত হয় রাতের আঁধার ঘটে “মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার”। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের টিভিরুমের সামনের করিডরে একসঙ্গে সাত ছাত্রের দেহ ঝাঁজরা হয় বুলেটের সুতীক্ষ আঘাতে। প্রতিদিনের মতো সেই রাতেও মুহসীন হল ও সূর্যসেন হলে ঘুম নেমেছিল। ঘুম নেমেছিল সূর্যসেন হলের ৬৩৫ ও ৬৪৮ নম্বর কক্ষেও। পার্থক্য শুধু এটুকুই, এই দুই কক্ষের ঘুমন্ত সাতজন তরুণ মধ্যরাতে চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে পরিণত হয়েছিল এক শিহরণ জাগানো খবরে। ১০-১৫ জন সশস্ত্র ব্যক্তি ওই দুই কক্ষ থেকে সাতজন ছাত্রকে ‘হ্যান্ডসআপ’ করে মুহসীন হলে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। ৪১ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত নারকীয় এই হত্যাযজ্ঞ আলোচিত ‘সেভেন মার্ডার’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে এই বীভৎস হত্যাযজ্ঞের সংবাদ মুখে মুখে রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর রাজধানী ছাপিয়ে গোটা দেশ। আতঙ্ক তখন চারদিকে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল। সাধারণ ছাত্ররা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে হল ছাড়তে শুরু করে। রাতের বেলা ভৌতিক পরিবেশ। ৬ এপ্রিলের পত্রিকায় কালো হেডিংয়ে প্রধান শিরোনাম হয়। নিউইয়র্ক টাইমসসহ বিদেশি গণমাধ্যমগুলো গুরুত্ব সহকারে এ সংবাদটি প্রকাশ করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে এই সেভেন মার্ডারের ঘটনার মতো আর কোনো ঘটনাই সেই সময়ে এমন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খুনের ঘটনা বলতে প্রথমেই চলে আসে ঢাবির এই ‘সেভেন মার্ডার’ এর ঘটনা। এ হত্যাকাণ্ডে যাদের দণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তাদের সেই দণ্ড ভোগ করতে হয়নি। উপরন্তু তারা এখন দেশের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। যে কারণে এ ঘটনার বিষয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই।

 

“মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার”                                                ইত্তেফাক পত্রিকার প্রথম পাতার শিরোনামে মুহসীন হলের সাত খুন
সেদিন যা ঘটেছিল : ৪ এপ্রিল, ১৯৭৪ সাল। রাতে সূর্যসেন হলের ৬৩৫ নম্বর কক্ষে কয়েকজন ছাত্র গল্প করছিলেন। ওই কক্ষেই ছিলেন নাজমুল হক কোহিনুর। রাত ১২টার কিছু পরে কোহিনুরের বন্ধুরা যে যার রুমে চলে যান। এর কিছুক্ষণ পরই সবাই ঘুমিয়ে পড়েন। রাত ১টা ২৫ মিনিটে সূর্যসেন হল থেকে প্রথম ২-৩টা গুলির শব্দ পাওয়া যায়। এ সময় ১০ থেকে ১৫ জন অস্ত্রধারী হলের ভিতর ঢুকে সিঁড়ি বেয়ে পঞ্চম তলায় উঠে আসে। প্রথমে তারা ৬৩৪ নম্বর রুমের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে কোহিনুর নাম ধরে ডাকতে থাকে। ওই কক্ষের ভিতর থেকে এক ছাত্র পাশের কক্ষে যোগাযোগ করতে বলেন। অস্ত্রধারীরা পাশের ৬৩৫ নম্বর কক্ষের দরজার সামনে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকে। কোহিনুরকে দরজা খুলতে বলে। কিছুক্ষণ এ অবস্থা চলতে থাকলে কোহিনুর ভিতর থেকে দরজা খুলে দেন। এরপরই অস্ত্রধারীরা তাদের ‘হ্যান্ডসআপ’ করতে বলে। কোহিনুরসহ ওই কক্ষে তখন ছিলেন চারজন। চারজনই মাথার ওপর হাত তুলে কক্ষ থেকে বের হন। অস্ত্রধারীদের অপর গ্রুপ ৬৪৮ নম্বর কক্ষ থেকে আরও তিনজনকে একই কায়দায় বের করে নিয়ে আসে। এই সাতজনের দিকে অস্ত্র তাক করে সারিবদ্ধভাবে হাঁটিয়ে ৫ তলা থেকে নিচে নামিয়ে আনে। এ সময় কোহিনুর বিষয়টি আঁচ করতে পারে। তাকে প্রাণে না মারার জন্য আকুতি মিনতি করতে থাকেন। দোতলা পর্যন্ত তারা নামার পর ২১৫ নম্বর কক্ষের সামনে গিয়ে আরও এক ছাত্রের খোঁজ করে অস্ত্রধারীরা। ওই ছাত্র বিপদ আঁচ করতে পেরে জানালা ভেঙে দোতলা থেকে নিচে লাফিয়ে পড়েন। ততক্ষণে অস্ত্রধারীরা দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে যায়। ওই ছাত্রকে না পেয়ে অস্ত্রধারীরা জানালার কাছে গিয়ে দেখতে পায় যে, কেউ দৌড়ে পালাচ্ছেন। তখন জানালা দিয়ে অস্ত্রধারীরা গুলি করে। কিন্তু ওই ছাত্রটি পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়। সাতজন হতভাগ্য ছাত্রকে যখন সূর্যসেন হল থেকে মুহসীন হলের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয় তখন রাত ২টা চার মিনিট। মুহসীন হলের টিভিরুমের সামনের করিডরকে বধ্যভূমি হিসেবে নির্বাচিত করে সাতজনকে সেখানে দাঁড় করানো হয়। রাত ২টা ১১ মিনিটে হতভাগ্য ওই ছাত্রদের লক্ষ্য করে ‘ব্রাশফায়ার’ শুরু হয়। গুলিবিদ্ধ ওই ছাত্ররা লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে করতে প্রাণ হারান। রক্তে ভেসে যায় পুরো করিডর। তাদের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও অস্ত্রধারীরা এ সময় ফাঁকা গুলি ছুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এরপর রাত ২টা ২৫ মিনিটে তারা ধীরেসুস্থে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ভোর ৪টা ৫৫ মিনিটে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এর অল্প সময়ের মধ্যে লাশ ময়নাতদন্তের জন্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। ঘটনাস্থল থেকে সামান্য দূরে রয়েছে একটি পুলিশ ফাঁড়ি। অন্যদিকে পুলিশ কন্ট্রোল রুম। অস্ত্রধারীরা রাত ১টা ২৫ মিনিট থেকে তাদের তৎপরতা শুরু করে। হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে ২টা ২৫ মিনিটে চলে যায়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে অস্ত্রধারীদের এমন তৎপরতায়ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে যায়নি। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।

“মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার”
নিহতদের পরিচয় : নাজমুল হক কোহিনুর, সোশিওলোজি এমএ ২য় পর্ব, গ্রাম বৈলা, রূপগঞ্জ। মো. ইদ্রিস, এমকম ১ম পর্ব, ১১৫/১১৬ চক মোগলটুলী, ঢাকা। রেজওয়ানুর রব, প্রথম বর্ষ (সম্মান), সোশিওলোজি, ৩৯/২, পাঁচ ভাই ঘাট লেন, ঢাকা। সৈয়দ মাসুদ মাহমুদ, প্রথম বর্ষ (সম্মান) সোশিওলোজি, ৩৪ ঠাকুর দাস লেন, বানিয়ানগর, ঢাকা। বশিরউদ্দিন আহমদ (জিন্নাহ), এমকম ১ম পর্ব, ২৯ ডিস্ট্রিলারি রোড, ঢাকা। আবুল হোসেন প্রথম বর্ষ (সম্মান) সোশিওলোজি, পাইকপাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এবাদ খান, প্রথম বর্ষ (সম্মান) সোশিওলোজি, পাইকপাড়া, ধামরাই। নারকীয় হত্যাযজ্ঞের তিন দিন পর পুলিশ ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধানসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে। অপর দুজন হলেন, কামরুজ্জামান ওরফে কামরুল এবং মাহমুদুর রহমান ওরফে বাচ্চু।
পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে এই হত্যাযজ্ঞে শফিউল আলম প্রধান সরাসরি জড়িত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই নারকীয় ঘটনা ঘটে বলে পুলিশের তদন্তে বলা হয়। বিচার কাজ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর আমলেই বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ’৭৫-এর পর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। বরং জিয়া সরকার আমলে তাকে বিএনপিতে যোগদানের শর্তে ক্ষমা ঘোষণা করে মুক্তি দেওয়া হয়।

 

“মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার”

 

স্বাধীন বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি সর্বপ্রথম রক্তের লালে রঞ্জিত হয় ১৯৭৪ সালে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও স্বাধীনতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ছাত্রলীগের খুনের রাজনীতির শুরুও তখন থেকেই। ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে নির্মমভাবে খুনের শিকার হন ছাত্রলীগ করা ৭জন শিক্ষার্থী। পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে এই সাত খুন ঘটনার মূল কারিগর ছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান। পুরো দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি “মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার” নামে পরিচিতি পায়।

 

১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল দিবাগত রাত ১টা ১৫ মিনিটে সূর্যসেন হলে ২/৩ রাউন্ড গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে ঢাবির সুনসান ক্যাম্পাস। এর কিছুক্ষণ পরে তৎকালীন ছাত্রলীগ সম্পাদক প্রধানের নেতৃত্বে একদল অস্ত্রধারী সূর্যসেন হলে প্রবেশ করে। তাদের মূল টার্গেট ছিল ছাত্রলীগ নেতা নাজমুল হক কোহিনুরকে হত্যা করা। খুনিরা সূর্যসেন হলের পঞ্চম তলার ৬৩৪ নম্বর রুমের সামনে গিয়ে কোহিনুরের নাম ধরে ঢাকতে থাকে। কিন্তু সে রুমে কোহিনুরকে না পেয়ে তারা ৬৩৫ নম্বর রুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে কোহিনুরকে ডাকতে থাকে। একসময় ভেতর থেকে বের হয়ে আসেন কোহিনুর, তার সাথে ছিলেন আরও তিনজন। অস্ত্রধারীরা এই চারজনকে “হ্যান্ডস আপ” করিয়ে নিয়ে আসেন মুহসীন হলে টিভি রুমের সামনে। একই কায়দায় অস্ত্রধারীদের আরেক দল ৬৪৮ নম্বর রুম থেকে আরও তিন জনকে মুহসীন হলের টিভি রুমের সামনে নিয়ে আসেন। এই সময়ের মধ্যে অস্ত্রধারীরা সূর্যসেন হলের ২১৫ নম্বর রুমে আরও এক ছাত্রের খোঁজ করেন। কিন্তু সে ছাত্র বিপদ আঁচ করতে পেরে জানালা দিয়ে দোতলা থেকে থেকে লাফ দিয়ে নিজের প্রাণ রক্ষা করেন।

“মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার”

শফিউল আলম প্রধান

রাত ২টা ১১ মিনিটে মুহসীন হলের টিভি রুমের সামনের করিডরে দাঁড়া করিয়ে ওই সাত ছাত্রকে ব্রাশ ফায়ার করা হয়। সবার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর রাত ২টা ২৫ মিনিটে ফাকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে অস্ত্রধারীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করে। ঘটনার প্রায় আড়াই ঘন্টা পর ভোর ৪টা ৫৫ মিনিটে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে পাঠায়।

এই ঘটনায় যারা খুন হন তারা সবাই ছিলেন আওয়ামী যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনির সমর্থক। সাত খুন হত্যা মামলার প্রধান আসামী শফিউল আলম প্রধান ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৩-৭৪ সালের ছাত্রলীগের সম্মেলনকে ঘিরে দুইটি কমিটির প্রস্তাব ছাত্রলীগের কর্মীদের মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটি মনির-প্রধান (মনিরুল হক চৌধুরী- শফিউল আলম প্রধান) পরিষদ, অপরটি রশিদ-হাসান (এমএ রশিদ- রাশিদুল হাসান) পরিষদ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের সমর্থন ছিল মনির-প্রধান পরিষদের পক্ষে, অন্যদিকে যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলুল হক মনির সমর্থন ছিল রশিদ-হাসান পরিষদের পক্ষে। শেষ পর্যন্ত ছাত্রলীগ কর্মীদের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হয় মনির-প্রধান পরিষদ। প্রতিপক্ষের উসকানিতে শফিউল আলম প্রধান শেখ ফজলুল হক মনির সমর্থক সেই শিক্ষার্থীদের হত্যা করেন বলেন অভিযোগ আছে।

হত্যার পরের দিন হত্যার বিচারের দাবিতে ছাত্রলীগ মিছিল বের করে। তারা সারা দেশে শোক দিবস আহ্বান করে। হত্যার দাবিতে করা মিছিলে প্রধানকেও নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়। এমনকি পত্রপত্রিকায় বিবৃতিও দেন তিনি। সাত খুন ঘটনার তিন দিন পর প্রধানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

সাত খুনের বিচার এবং প্রধানের মুক্তির দাবিতে তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতির বিবৃতি

প্রধান সেসময় বাংলাদেশ ছাত্রলীগে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। সাত খুন হত্যার বিচারের দাবির পাশাপাশি, শফিউল আলম প্রধানসহ ছাত্রলীগের তিন কর্মীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে। খুনি প্রধানকে বাঁচাতে ছাত্রলীগের কর্মীরা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যায়। তারা সারা দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ডাক দেয়।

আমাদের জাতীয় চার নেতার একজন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলী বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই শফিউল আলম প্রধানকে গ্রেপ্তার করেছে সরকার। কিন্তু তৎকালীন ছাত্রলীগ মনসুর আলীর বক্তব্যেরও বিরোধিতা করে প্রধানের মুক্তি দাবি করে। তবে বঙ্গবন্ধুর সরকার কোন কিছুতেই দমে যায়নি। নিজ দলের ছাত্র সংগঠনের খুনি নেতাদের প্রতি কোন সহমর্মিতা দেখায়নি। পুলিশি তদন্তে এই হত্যাকান্ডে প্রধানের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ উঠে আসে। পুলিশি তদন্তে বলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে(ডাকসু) কেন্দ্র করে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটে। (এখানে একটি কথা উল্লেখ করা যেতে পারে যে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম ডাকসু নির্বাচনে সরকার সমর্থিত ছাত্রলীগ জয় লাভ করতে পারেনি। ১৯৭৩ সালের ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল সরকার সমর্থিত ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। সে নির্বাচনে সরকার সমর্থিত ছাত্রলীগ ব্যালট বাক্স ছিনতাই করার মতো ঘটনাও ঘটায়।)

তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে ছাত্রলীগ সভাপতির বিবৃতি

আওয়ামী সরকারের আমলেই সাত খুন হত্যা মামলার বিচারকার্য শেষ হয়। শফিউল আলম প্রধানের যাবজ্জীবন শাস্তি হয়। প্রধান দাবি করেন তিনি বিরোধীদের ষড়যন্ত্রের শিকার। ছাত্রলীগের অনেক নেতা-কর্মীই সেসময় প্রধানের এই শাস্তি মেনে নিতে পারেননি। সেসময় প্রধান এতটাই প্রভাবশালী ছাত্র নেতা ছিলেন যে, তিনি ছাত্রলীগের এক প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজদের একটি তালিকা প্রকাশ করেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে সেই দুর্নীতিবাজদের বিচার দাবি করেন। প্রধানের এমন কর্মকান্ডে দলের ভেতরে ও বাইরে তার শত্রুর অভাব ছিল একথা যেমন সত্য, তেমনি সাত খুনের ঘটনায় জড়িত রাজসাক্ষীদের জবানবন্দীতে প্রধানের নাম উঠে আসাটাও ফেলে দেবার মতো নয়।

রাজসাক্ষীদের স্বীকারোক্তি

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার মৃত্যুর পর বাংলাদেশের রাজনীতির পট পরিবর্তন হলে শাস্তি থেকে বেঁচে যান প্রধান। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান বিএনপিতে যোগদানের শর্তে প্রধানকে মুক্তি দেন এবং তাকে আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতিতে ব্যবহার করেন। প্রধানও জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) নামে একটি নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করে আজীবন বিএনপির পাশে থেকেছেন।

 

 

“মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার”

 

স্বাধীন বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি সর্বপ্রথম রক্তের লালে রঞ্জিত হয় ১৯৭৪ সালে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও স্বাধীনতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ছাত্রলীগের খুনের রাজনীতির শুরুও তখন থেকেই। ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে নির্মমভাবে খুনের শিকার হন ছাত্রলীগ করা ৭জন শিক্ষার্থী। পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে এই সাত খুন ঘটনার মূল কারিগর ছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান। পুরো দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি “মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার” নামে পরিচিতি পায়।

 

১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল দিবাগত রাত ১টা ১৫ মিনিটে সূর্যসেন হলে ২/৩ রাউন্ড গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে ঢাবির সুনসান ক্যাম্পাস। এর কিছুক্ষণ পরে তৎকালীন ছাত্রলীগ সম্পাদক প্রধানের নেতৃত্বে একদল অস্ত্রধারী সূর্যসেন হলে প্রবেশ করে। তাদের মূল টার্গেট ছিল ছাত্রলীগ নেতা নাজমুল হক কোহিনুরকে হত্যা করা। খুনিরা সূর্যসেন হলের পঞ্চম তলার ৬৩৪ নম্বর রুমের সামনে গিয়ে কোহিনুরের নাম ধরে ঢাকতে থাকে। কিন্তু সে রুমে কোহিনুরকে না পেয়ে তারা ৬৩৫ নম্বর রুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে কোহিনুরকে ডাকতে থাকে। একসময় ভেতর থেকে বের হয়ে আসেন কোহিনুর, তার সাথে ছিলেন আরও তিনজন। অস্ত্রধারীরা এই চারজনকে “হ্যান্ডস আপ” করিয়ে নিয়ে আসেন মুহসীন হলে টিভি রুমের সামনে। একই কায়দায় অস্ত্রধারীদের আরেক দল ৬৪৮ নম্বর রুম থেকে আরও তিন জনকে মুহসীন হলের টিভি রুমের সামনে নিয়ে আসেন। এই সময়ের মধ্যে অস্ত্রধারীরা সূর্যসেন হলের ২১৫ নম্বর রুমে আরও এক ছাত্রের খোঁজ করেন। কিন্তু সে ছাত্র বিপদ আঁচ করতে পেরে জানালা দিয়ে দোতলা থেকে থেকে লাফ দিয়ে নিজের প্রাণ রক্ষা করেন।

 

রাত ২টা ১১ মিনিটে মুহসীন হলের টিভি রুমের সামনের করিডরে দাঁড়া করিয়ে ওই সাত ছাত্রকে ব্রাশ ফায়ার করা হয়। সবার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর রাত ২টা ২৫ মিনিটে ফাকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে অস্ত্রধারীরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করে। ঘটনার প্রায় আড়াই ঘন্টা পর ভোর ৪টা ৫৫ মিনিটে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে পাঠায়।

এই ঘটনায় যারা খুন হন তারা সবাই ছিলেন আওয়ামী যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনির সমর্থক। সাত খুন হত্যা মামলার প্রধান আসামী শফিউল আলম প্রধান ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৩-৭৪ সালের ছাত্রলীগের সম্মেলনকে ঘিরে দুইটি কমিটির প্রস্তাব ছাত্রলীগের কর্মীদের মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটি মনির-প্রধান (মনিরুল হক চৌধুরী- শফিউল আলম প্রধান) পরিষদ, অপরটি রশিদ-হাসান (এমএ রশিদ- রাশিদুল হাসান) পরিষদ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের সমর্থন ছিল মনির-প্রধান পরিষদের পক্ষে, অন্যদিকে যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলুল হক মনির সমর্থন ছিল রশিদ-হাসান পরিষদের পক্ষে। শেষ পর্যন্ত ছাত্রলীগ কর্মীদের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হয় মনির-প্রধান পরিষদ। প্রতিপক্ষের উসকানিতে শফিউল আলম প্রধান শেখ ফজলুল হক মনির সমর্থক সেই শিক্ষার্থীদের হত্যা করেন বলেন অভিযোগ আছে।

হত্যার পরের দিন হত্যার বিচারের দাবিতে ছাত্রলীগ মিছিল বের করে। তারা সারা দেশে শোক দিবস আহ্বান করে। হত্যার দাবিতে করা মিছিলে প্রধানকেও নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়। এমনকি পত্রপত্রিকায় বিবৃতিও দেন তিনি। সাত খুন ঘটনার তিন দিন পর প্রধানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

“মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার”

সাত খুনের বিচার এবং প্রধানের মুক্তির দাবিতে তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতির বিবৃতি

প্রধান সেসময় বাংলাদেশ ছাত্রলীগে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। সাত খুন হত্যার বিচারের দাবির পাশাপাশি, শফিউল আলম প্রধানসহ ছাত্রলীগের তিন কর্মীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে। খুনি প্রধানকে বাঁচাতে ছাত্রলীগের কর্মীরা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যায়। তারা সারা দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ডাক দেয়।

মর্নিং ট্রিবিউনের অফিসিয়াল ফেসবুক লিংক

আমাদের জাতীয় চার নেতার একজন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলী বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই শফিউল আলম প্রধানকে গ্রেপ্তার করেছে সরকার। কিন্তু তৎকালীন ছাত্রলীগ মনসুর আলীর বক্তব্যেরও বিরোধিতা করে প্রধানের মুক্তি দাবি করে। তবে বঙ্গবন্ধুর সরকার কোন কিছুতেই দমে যায়নি। নিজ দলের ছাত্র সংগঠনের খুনি নেতাদের প্রতি কোন সহমর্মিতা দেখায়নি। পুলিশি তদন্তে এই হত্যাকান্ডে প্রধানের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ উঠে আসে। পুলিশি তদন্তে বলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে(ডাকসু) কেন্দ্র করে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটে। (এখানে একটি কথা উল্লেখ করা যেতে পারে যে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম ডাকসু নির্বাচনে সরকার সমর্থিত ছাত্রলীগ জয় লাভ করতে পারেনি। ১৯৭৩ সালের ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল সরকার সমর্থিত ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। সে নির্বাচনে সরকার সমর্থিত ছাত্রলীগ ব্যালট বাক্স ছিনতাই করার মতো ঘটনাও ঘটায়।)

আরও পড়ুন

আওয়ামী সরকারের আমলেই সাত খুন হত্যা মামলার বিচারকার্য শেষ হয়। শফিউল আলম প্রধানের যাবজ্জীবন শাস্তি হয়। প্রধান দাবি করেন তিনি বিরোধীদের ষড়যন্ত্রের শিকার। ছাত্রলীগের অনেক নেতা-কর্মীই সেসময় প্রধানের এই শাস্তি মেনে নিতে পারেননি। সেসময় প্রধান এতটাই প্রভাবশালী ছাত্র নেতা ছিলেন যে, তিনি ছাত্রলীগের এক প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজদের একটি তালিকা প্রকাশ করেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে সেই দুর্নীতিবাজদের বিচার দাবি করেন। প্রধানের এমন কর্মকান্ডে দলের ভেতরে ও বাইরে তার শত্রুর অভাব ছিল একথা যেমন সত্য, তেমনি সাত খুনের ঘটনায় জড়িত রাজসাক্ষীদের জবানবন্দীতে প্রধানের নাম উঠে আসাটাও ফেলে দেবার মতো নয়।

রাজসাক্ষীদের স্বীকারোক্তি

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার মৃত্যুর পর বাংলাদেশের রাজনীতির পট পরিবর্তন হলে শাস্তি থেকে বেঁচে যান প্রধান। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান বিএনপিতে যোগদানের শর্তে প্রধানকে মুক্তি দেন এবং তাকে আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতিতে ব্যবহার করেন। প্রধানও জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) নামে একটি নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করে আজীবন বিএনপির পাশে থেকেছেন।

মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার

সাত খুন হওয়ার দুই সপ্তাহ পর জহুরুল হক হলের পুকুরে অন্ত্র ও গ্রেনেড পাওয়া যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published.